মো. মোস্তফা খান, নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভোর তখনও পুরোপুরি হয়নি। চারপাশে কুয়াশা আর অন্ধকারের মিশ্র ছায়া। রায়পুরার রাস্তাগুলোতে টিমটিম করে জ্বলছে ল্যাম্পপোস্টের আলো। হঠাৎ করেই ভাঙতে শুরু করলো নীরবতা- দূরে কোথাও শোনা গেল ঢাকের শব্দ, ভেসে আসছে বাঁশির সুর, সঙ্গে করতালি আর উল্লাসধ্বনি। ঘুম ভাঙলো ছোট্র শহরের, উৎসবের সাজে জেগে উঠলো রায়পুরা।
সেদিন ছিল শুক্রবার, ৩ অক্টোবর। ভোর ৪টার পর থেকেই শুরু হলো আন্তর্জাতিকমানের রায়পুরা ম্যারাথন। ‘রান ফর বাংলাদেশ, রান ফর হেলথ’- এই স্লোগানে দেশ-বিদেশের সাত শতাধিক দৌড়বিদ যখন একসাথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন, তখন দৃশ্যটা যেন সিনেমার মতো। সবার চোখে ছিল স্বপ্ন, বুকভরা উদ্দীপনা আর একটাই লক্ষ্য- দৌড়, শুধু সামনে এগিয়ে চলা।

প্রথম বাঁশি বাজতেই শুরু হলো দৌড়। পায়ের ধ্বনিতে কেঁপে উঠলো নরসিংদী-রায়পুরার সড়ক। দর্শকের উল্লাসে আকাশ-মাটি মুখরিত। কেউ শিঙা বাজাচ্ছেন, কেউ মাদল। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ, শিশুরা করতালি দিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসাচ্ছেন দৌড়বিদদের। মুহূর্তেই সাড়ে দশ কিলোমিটারের পথ পরিণত হলো জীবন্ত উৎসবে।
দৌড়ের ভিড়ে ছিলেন প্রবীণ দৌড়বিদ খবির উদ্দিন খান। বয়স ৭৩ হলেও তার চোখে ছিল অদম্য দৃঢ়তা। মুখে ক্লান্তির রেখা নয়, বরং ছিল প্রাণের হাসি। হাসিমুখে বললেন, “নীরব দেহ যদি তোমরা চাও, তাহলে দৌড়ের কোন বিকল্প নাই। মাইরের ওপরে ঔষধ নাই, দৌড়ের উপরে কোন ব্যায়াম নাই।” তার কথা শুনে পাশের দৌড়বিদদের চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়লো নতুন উদ্যম।

প্রবীণ দৌড়বিদ খবির উদ্দিন খান। তিনি সোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান
দৌড়ের ভিড়ে ছিলেন এক নারী চিকিৎসক- ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিমু আক্তার। লাল-সাদা ড্রেসে তিনি যেন নারীর দৃঢ়তার প্রতীক। দৌড় শেষে নিঃসঙ্কোচে বললেন, “নারীদের সংখ্যা কম। এর কারণ হলো থাকার ভালো ব্যবস্থা নেই। যদি একটা হোটেল থাকতো, নারীরা আরও বেশি অংশ নিতো।” তার কণ্ঠে ছিল আক্ষেপ, তবে চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
মাঠজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল উৎসবের আবহ। স্বেচ্ছাসেবক ও গ্রামের কিশোরেরা দৌড়বিদদের পানি দিচ্ছে, মায়ের কোলে শিশুরা হাত নাড়িয়ে দৌড়বিদদের অভিবাদন জানাচ্ছে। মনে হচ্ছিল এ শুধু প্রতিযোগিতা নয় – এ এক জনমেলার মতো প্রাণোচ্ছল আয়োজন।

অবশেষে সমাপ্তির রেখা ছুঁয়ে বিজয়ীরা যখন হাত তুললেন, তখন চারদিক মুখরিত হলো করতালি আর উল্লাসে।
প্রধান অতিথি বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন (এনডিসি) বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। সেই মুহূর্তে বিজয়ীর চোখের জল আর আনন্দের চিৎকার যেন মিলেমিশে তৈরি করলো এক অনন্য দৃশ্য।

মঞ্চে ছিলেন নরসিংদী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন, পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম (পিপিএম), উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদ রানা, ওয়াটসন গ্রুপের এমডি ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুলসহ অনেকেই।

নিরাপত্তায় ছিলেন দেড়শতাধিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক দৌড়ের প্রতিটি মুহূর্তকে করে তুলেছিলেন নিরবচ্ছিন্ন ও সুশৃঙ্খল।
দৌড় শেষে সূর্য যখন পুরোপুরি ওঠে, তখন রায়পুরার আকাশে উড়ছিল উৎসবের রঙ। মানুষের চোখেমুখে তখনও ঝিলিক দিচ্ছিল সেই ভোরের আবেগ, সেই ছন্দময় দৌড়ের স্মৃতি। মনে হচ্ছিল – এ আয়োজন কেবল একটি ম্যারাথন নয়, বরং একটি স্বপ্নের দৌড়, সুস্থতার গান এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার কাহিনি।


