
মো. মোস্তফা খান, নিজস্ব প্রতিবেদক:
নরসিংদীর রায়পুরার শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ও খ্যাতনামা “বাদশাহভোগ” মিষ্টি এবার জিআই (Geographical Indication) পণ্যের স্বীকৃতির প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে লিখিতভাবে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
রবিবার (১১ জানিুয়ারী) বিকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা তাঁর কার্যালয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে বাদশাহভোগ মিষ্টিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির আবেদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রায়পুরার ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাদশাহভোগ মিষ্টিকে দেশের ২৭তম প্রস্তাবিত জিআই পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। “বাংলাদেশে বর্তমানে জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃত পণ্যের সংখ্যা ৬৪টি, আর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও ২৬টি। সবকিছু অনুকুলে থাকলে শিগগিরই রায়পুরার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি জিআই পণ্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির আলো দেখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে নরসিংদীর বিখ্যাত সাগরকলা ও লটকন ইতোমধ্যেই জিআই পণ্যের মর্যাদা পেয়েছে। এবার বাদশাহভোগ সেই কাতারে যুক্ত হলে রায়পুরা নতুনভাবে দেশের গর্বের প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নেবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী “বাদশাহভোগ” মিষ্টি রায়পুরার সংস্কৃতি ও গর্বের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। খাঁটি গাভীর দুধ, নিখুঁত কারিগরি ও প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী রেসিপিতে তৈরি এই মিষ্টি অতুলনীয় স্বাদের জন্য সুপরিচিত। প্রতিটি মিষ্টির ওজন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর রসাল, নরম ও মুখরোচক স্বাদ একবার খেলে ভোলার নয়- যার কারণে রায়পুরায় বেড়াতে এসে “বাদশাহভোগ” না কিনে কেউ ফিরে যান না।
রায়পুরা বাজারের মধুময় মিষ্টিঘরের স্বত্তাধিকারী রাজীব কুমার গোপসহ একাধিক মিস্টি ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সুনামের কারণে “বাদশাহভোগ” মিষ্টি রায়পুরার অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে এর ব্র্যান্ডিং, মানোন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে তারা মনে করেন।

ই-কমার্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাকলী তালুকদার বলেন: নরসিংদী জেলায় বর্তমানে দুটি জিআই পণ্য (কলা ও লটকন) রয়েছে। তবে উপজেলা পর্যায় থেকে এই প্রথম কোনো জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হলো, যা রায়পুরার জন্য গৌরবের বিষয়। এইবার ‘বাদশাহভোগ মিষ্টি’র জিআই প্রক্রিয়ার কাজটি আমার প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (ইডিসি) থেকে নয়, বরং সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। গত এক বছর ধরে রায়পুরার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে তথ্য- উপাত্ত সংগ্রহ করে ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করেছি। এই উদ্যোগে কোনো টিমওয়ার্ক ছিল না- শুধুমাত্র আমি এবং আমার কাজিন তাবাসসুম হোসেন (কামরুন্নাহার), যিনি এ প্রকল্পের কনটেন্ট রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন, আমরা দুজন মিলে পুরো কাজটি করেছি। আমরা রায়পুরা উপজেলার ইউএনও মহোদয়কে এই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে স্বেচ্ছাসেবী (ভলান্টিয়ারি) হিসেবে সহায়তা প্রদান করেছি। আমরা দুজনেই রায়পুরার মেয়ে, তাই এলাকার প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছি।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদ রানা বলেন, “রায়পুরার ‘বাদশাহভোগ’ শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক। শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই মিষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রায়পুরার মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রমের প্রতিফলন। ‘বাদশাহভোগ’ মিষ্টি আমাদের লোকজ ঐতিহ্য ও কারিগরি দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন। এর জিআই স্বীকৃতি পেলে তা শুধু রায়পুরা নয়, নরসিংদী জেলার জন্যও গর্বের বিষয় হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ স্বীকৃতি রায়পুরাকে নতুনভাবে তুলে ধরবে, যা আমাদের স্থানীয় অর্থনীতি, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমি এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাদের এই অবদান রায়পুরার ঐতিহ্য সংরক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমি বিশ্বাস করি, ‘বাদশাহভোগ’ একদিন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা জিআই স্বীকৃত পণ্য হিসেবে বিশ্বে রায়পুরার পরিচয়কে আরও উজ্জ্বল করবে।”


