
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নিয়োগবিধি সংশোধন, বেতন বৈষম্য দূরীকরণ এবং টেকনিক্যাল পদমর্যাদা প্রদানের দাবিতে টানা সপ্তম দিনের মতো কর্মবিরতি করছেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। আগামীকাল রবিবার (৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর মহাখালীস্থ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে দিনব্যাপী লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন তারা।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) চলমান কর্মসূচি থেকে সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা ঢাকায় সমবেত হয়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন — বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদের সদস্যসচিব ফজলুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে। তিনি জানান, তাদের দাবি বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন (জিও) প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থান কর্মসূচি চলবে।
গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) শহীদ মিনারে শুরু হওয়া কর্মবিরতি প্রথম তিন দিন সেখানে চলার পর স্বাস্থ্য সহকারীরা অবস্থান নেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে। বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে দেশের ৬৪ জেলার স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকেরা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
এই কর্মসূচির কারণে কয়েক দিন ধরে সারাদেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে টিকা নিতে এসে অনেক মা ও শিশুকে ফিরে যেতে হচ্ছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতা। দ্রুত সমাধান না হলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে পড়তে পারে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য।
স্বাস্থ্য সহকারীরা বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে কর্মবিরতিতে যেতে তারা চাননি, কিন্তু দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে বাধ্য হয়েছেন। ২৭ বছর ধরে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা অভিযোগ করে বলেন, “আমরা যখনই দাবির বিষয়ে আবেদন জানাই, তখনই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চিঠি চালাচালি শুরু করেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই আমাদের দাবি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। বারবার ভুল তথ্য দিয়ে তারা মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠায়, ফলে মন্ত্রণালয় নিরীক্ষা শেষে ফাইল ফেরত পাঠায়। এই ‘শান্তনার খেলা’ বন্ধ করতে হবে।”
তারা আরও বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই আমাদের অভিভাবক। তাই দ্রুত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের দাবি বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কর্মস্থলে ফিরব না। এখন আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে — প্রয়োজনে আরও কঠোর হতে বাধ্য হব।”
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত এসব স্বাস্থ্য সহকারীরা জানান, তারা টিকাদানের আগে মাসজুড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নবজাতক ও গর্ভবতী মায়ের তথ্য সংগ্রহ, যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণ, ডটস (সরাসরি পর্যবেক্ষণ থেরাপি) পদ্ধতিতে ওষুধ খাওয়ানো, উঠান বৈঠক, মা সমাবেশসহ নানা সেবা দিয়ে থাকেন। সপ্তাহে তিন দিন কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত সেবা দেওয়ার পরও তাদের মাসিক ভ্রমণভাতা মাত্র ৬০০ টাকা এবং মোট বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা।
ইন-সার্ভিস ডিপ্লোমা (এসআইটি) সম্পন্ন করা স্বাস্থ্য সহকারীরা বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী ইন-সার্ভিস ডিপ্লোমা (এসআইটি) কোর্স সম্পন্ন করেছেন প্রায় ২ হাজার ২০০ জন স্বাস্থ্য সহকারী। কিন্তু তাদের কারও যোগ্যতাকে সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমাদের মতো বৈষম্যের শিকার অন্য কোনো বিভাগ দেশে নেই।”
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
* নিয়োগবিধি সংশোধন করে স্নাতক বা সমমানের যোগ্যতা যুক্ত করে **১৪তম গ্রেড প্রদান,
* ইন-সার্ভিস ডিপ্লোমাধারীদের ১১তম গ্রেডসহ টেকনিক্যাল পদমর্যাদা প্রদান,
* ধারাবাহিকভাবে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি নিশ্চিতকরণ,
* প্রশিক্ষণ ছাড়াই স্নাতক স্কেলে অন্তর্ভুক্তি,
* বেতনস্কেল পুনর্নিধারণের সময় টাইম স্কেল বা উচ্চতর স্কেল সংযুক্তকরণ,
* এবং ন-সার্ভিস ডিপ্লোমা (এসআইটি) সম্পন্নকারীদের সমমান স্বীকৃতি প্রদান।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদের সদস্যসচিব ফজলুল হক চৌধুরী আরও বলেন,
“আমাদের প্রস্তাবিত দাবির ফাইল ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি, তারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত বৈষম্য শিকার স্বাস্থ্য সহকারীদের দাবিগুলো গুরুত্বসহ বিবেচনা করবেন। দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি হলে আমরা কর্মস্থলে ফিরে যাব।”


